Children Communication Network প্রতিবেদন সন্তানের জন্য জেলিফিশ প্যারেন্টিং ভালো না খারাপ ?

সন্তানের জন্য জেলিফিশ প্যারেন্টিং ভালো না খারাপ ?

ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ:

সব মা–বাবাই সন্তানের মঙ্গল চান। এই চিন্তা মাথায় রেখেই তাঁরা সন্তান লালনপালন করেন। তবে সবার সন্তান পালনের ধরন এক রকম নয়। একেক দেশের সমাজব্যবস্থা, পারিবারিক মূল্যবোধ অনুযায়ী তা একেক রকম হয়। আবার একই সমাজের মধ্যেও চালু আছে নানা রকম ধরন। আমাদের এখানে কয়েক বছর আগেও কর্তৃত্বপরায়ণ বা কঠোরভাবে (অথরেটেটিভ প্যারেন্টিং) সন্তান পালনের ধরনটিকে তুলনামূলক কার্যকর বলে বিবেচনা করা হতো। আজকাল আবার যেমন জেলিফিশ প্যারেন্টিং নিয়ে আলোচনা হচ্ছে খুব। বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই এই ধরন এখন বেশ জনপ্রিয়। এখানে শিশু–কিশোরদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা আর নিজের মতপ্রকাশের সক্ষমতা সবচেয়ে গুরুত্ব পায়। সন্তানের ইচ্ছাই এখানে সব।

কেন এটি জেলিফিশ প্যারেন্টিং

জেলিফিশ যেমন নরম, তুলতুলে; জেলিফিশ ধরনের মা-বাবারাও তেমনই। নিজেদের কোনো সিদ্ধান্ত তাঁরা সন্তানের ওপর চাপিয়ে দেন না। নমনীয়ভাবে তাঁরা সন্তান লালনপালন করেন। এ ধরনের অভিভাবকেরা সন্তানের জন্য কোনো নিয়মকানুন তৈরি করেন না। সন্তানের ইচ্ছার সঙ্গে তাঁরা তাল মিলিয়ে চলেন, সন্তানের নেতৃত্বে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

জেলিফিশ প্যারেন্টিংয়ের বৈশিষ্ট্য

  • সন্তানের সব সিদ্ধান্তে মা–বাবা সায় দেন। অনেকটা সন্তানের নেতৃত্বেই মা–বাবা পরিচালিত হন।
  • মা–বাবা সন্তানের সামনে রোলমডেল হিসেবে দেখা দেন না।
  • সন্তানকে সাধারণত কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয় না, সন্তানের জন্য তেমন নিয়মও দাঁড় করান না।
  • সন্তানের সঙ্গে কোনো বিষয়ে বিরোধে জড়ান না।
  • সন্তানের কাছে বাবা-মায়ের প্রত্যাশাও তেমন থাকে না।
  • মুদ্রার এপিঠ–ওপিঠ

    জেলিফিশ প্যারেন্টিংয়ে সন্তান পালনের সুবিধা, অসুবিধা, ভালো–মন্দ—দুইই আছে।

    ভালো দিক

    • সন্তানের সঙ্গে হৃদ্যতাপূর্ণ, বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
    • সন্তানের সঙ্গে কার্যকরী যোগাযোগ তৈরি হয়।
    • সন্তানেরা একটি কমফোর্ট জোনে (চাপহীন আরামদায়ক বলয়) থেকে বড় হয়। মা–বাবার কাছেও নিরাপদ বোধ করে।
    • বাবা–মায়ের কাছে এ ধরনের সন্তানেরা কিছু গোপন করে না।
    • এ পদ্ধতিতে সন্তানদের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা ও দক্ষতা তৈরি হয়। তারা আত্মবিশ্বাসী হয়ে বেড়ে ওঠে।
    • সন্তানেরা বাইরের জগতকে ভালোভাবে বুঝতে শেখে।
    • যেকোনো পরিবর্তনকে তারা সহজভাবে নিতে পারে। যেকোনো পরিস্থিতিতে টিকে থাকার চ্যালেঞ্জ নিতে পারে।
    • সন্তানের মধ্যে নেতৃত্ব দেওয়ার গুণাবলি গড়ে ওঠে। তারা সফলভাবে নিজের ক্যারিয়ার সাজিয়ে নিতে পারে।

    মন্দ দিক

    • বাবা–মায়ের নজরদারি না থাকায় সন্তানের বখে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। চারপাশের নেতিবাচক পরিবেশ দ্বারা সন্তান সহজেই খারাপ দিকে প্রভাবিত হতে পারে।
    • সন্তানের জীবনের লক্ষ্য ঘন ঘন পরিবর্তিত হতে পারে। এটা তার মনকেও বিচলিত করে তুলতে পারে।
    • সন্তানেরা যেহেতু কোনো নিয়মকানুনের মধ্যে বড় হয় না, তাই সহজেই নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলতে পারে তারা।
    • নিজে নিজে সব সমস্যার সমাধান করতে হয় বলে তাদের মধ্যে উদ্বেগ বা স্ট্রেস দেখা দিতে পারে। মনের ওপর পড়তে পারে বাড়তি চাপ।
    • নেতিবাচক পরিস্থিতির অভিজ্ঞতা না থাকায় কখনো বিপদে জড়িয়ে পড়তে পারে। যেমন রাত করে বাড়িতে ফেরার সময় খারাপ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে পারে।
    • বাংলাদেশের জন্য কতটা উপযোগী?

      জেলিফিশ প্যারেন্টিং পশ্চিমা দুনিয়ায় কার্যকর হলেও আমাদের দেশের জন্য কতটুকু উপযোগী, অনেকের মনেই এ প্রশ্ন আছে। কেবল প্যারেন্টিংকে জেলিফিশ মডেলে নিয়ে গেলাম আর সামাজিক নিরাপত্তাবলয় তৈরি করতে পারলাম না, তাহলে সেটা সফল হবে না। চারপাশকে সন্তানের জন্য উপযোগী করতে না পারলে জেলিফিশ প্যারেন্টিংয়ের কার্যকারিতা কমে যাবে। তাই সামগ্রিক সাংস্কৃতিক পরিবর্তন ইতিবাচক না হলে জেলিফিশ প্যারেন্টিংয়ের উপকারিতা পাওয়া যাবে না। তখন বরং শিশুরা দ্বিধার মধ্যে পড়ে যাবে।

      আর বাস্তবতা হচ্ছে, কোনো মা–বাবাই সন্তান পালনে সব সময় একটি ধরনের মধ্যে নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখতে পারেন না। বরং ভারসাম্য রক্ষা করে সব ধরনের প্যারেন্টিং স্টাইল থেকে ইতিবাচক বৈশিষ্ট্যগুলো নিয়ে নিজ সমাজসংস্কৃতির উপযোগী করে নেওয়া গেলে কার্যকর হবে। এ দেশের পেক্ষাপটে জেলিফিশ প্যারেন্টিংয়ের মন্দ দিকগুলো মাথায় রেখে চারপাশের উপযোগী করে সন্তান পালন করতে হবে। ভারসাম্যমূলক প্যারেন্টিংই সন্তানের মনোসামাজিক বিকাশকে সাবলীল করতে পারে।

      মোদ্দাকথা হলো নাটাইয়ের নিয়ন্ত্রণ রেখে ঘুড়িকে উড়তে দিন। তবে ঘুড়িকে এত ওপরেও ওড়ানো যাবে না, যাতে সুতা কেটে যায়। আবার কেটে যাওয়ার ভয়ে নাটাইয়ের সঙ্গে ঘুড়িকে লেপটে রেখে তার ওড়াউড়ি বন্ধ করা যাবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Post

কীভাবে মিটবে সন্তানের সঙ্গে দ্বন্দ্বকীভাবে মিটবে সন্তানের সঙ্গে দ্বন্দ্ব

সন্তানের সঙ্গে দ্বন্দ্ব মেটাতে চাইলে সন্তানকে স্বাধীনতা দিন। তবে অবাধ স্বাধীনতা নয়। বিশেষ করে বয়ঃসন্ধিকালে সন্তানকে বড় করে তোলার সময় বাবা-মায়ের সবদিকে লক্ষ্য রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন অভিভাবক হিসেবে বাবা-মায়ের

মে দিবসের কথামে দিবসের কথা

১ মে বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষের জন্য একটি মহান দিবস। শ্রমজীবী মানুষের অধিকারের বিষয় আসলেই প্রথমে উঠে আসে মে দিবস বা আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসের কথা। আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস (মে দিবস নামেও

পৃথিবীটা আসলে ভাল জায়গাই!পৃথিবীটা আসলে ভাল জায়গাই!

মেয়েকে বোঝাতে হবে সতর্কতা কতটা জরুরি। বুঝিয়ে দিতে হবে, মানুষ চিনতে শেখা কতটা দরকার। মানছি, মাঝে মাঝে নিজেদেরও এটা বোঝানো কঠিন হয়ে পড়ে। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত যে সব খবরের মাঝে বাস করি আমরা, তাতে সেটা অস্বাভাবিকও নয়। বিশেষ করে যাঁরা টিনএজার মেয়েদের বাবা-মা, তাঁরা যে দুশ্চিন্তায় ভুগবেন, সেটা খুবই স্বাভাবিক। কারণ আশপাশের পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, বাস্তব পৃথিবীই হোক বা ভার্চুয়াল জগৎ, মেয়েদের নিরাপত্তা নিয়ে খুব সিরিয়াসলি ভাবনাচিন্তা করার সময় এসেছে। এরকম অবস্থায় কেউই কী করে নিশ্চিন্ত থাকতে পারে বলুন? কিন্তু আপনাদের তো দুশ্চিন্তায় ভেঙে পড়লে চলবে না। আপনাদের মেয়েও তো চারপাশের অবস্থা দেখছে, বুঝছে। ভয় কিন্তু সে-ও পাচ্ছে। আপনারাও যদি ভেঙে পড়েন, মেয়েকে কে বোঝাবে? তাকে বোঝাতে হবে সতর্কতা কতটা জরুরি। বুঝিয়ে দিতে হবে, মানুষ চিনতে শেখা কতটা দরকার। আর সবচেয়ে বড় কথা, মেয়েদের মনে এই বিশ্বাসের ভিত গড়ে দিতে হবে যে, ভাল-খারাপ সর্বত্রই থাকে। কিন্তু পৃথিবীটা আসলে ভাল জায়গাই! প্রথম কথা… যেটাকে বাবা-মা এবং যে কোন বয়সি ছেলেমেয়ের সম্পর্কের থাম্বরুল বলা যায়… তা হল, সন্তানের বন্ধু হয়ে ওঠা। এই অভ্যেসটা যদি ছোটবেলা থেকে করে ফেলতে পারেন, যদি ছোট থেকেই সন্তানের জীবনে কী ঘটছে, তা নিয়ে সে আপনার সঙ্গে গল্পগুজব করতে পারে, তাহলে টিন-এজে পৌঁছেও তার সেই অভ্যেস থেকে যাবে। কার সঙ্গে সে মিশছে, কারা তার প্রতি ‘অ্যাডমিরেশন’ দেখাচ্ছে, বা কেউ কোনওভাবে তার বিরক্তি বা অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠছে কি না… কোনওকিছুই আপনাদের বলতে সে দ্বিধা করবে না। সম্পর্কে এই স্বচ্ছতাটা সকলের আগে দরকার। সন্তানের বোঝা দরকার, যে আপনারা তার বন্ধু। আপনাদের কাছ থেকে কিছু লুকনোর কোনও দরকার নেই তার। বিশেষ করে, কারও কোনও ব্যবহারে যদি আপনাদের মেয়ে অস্বচ্ছন্দ বোধ করে,  আপনাদের সে কথা খোলাখুলি বলার মতো কমফর্ট যেন সে পায়। ওকে বুঝিয়ে দিন যে আপনারা সবসময়, সব অবস্থায় ওর পাশে রয়েছেন। পৃথিবীর আর পাঁচটা জিনিসের মতো সোশ্যাল মিডিয়ারও ভাল-খারাপ দু’দিকই রয়েছে। আর এর আকর্ষণ এমনই অমোঘ, যে এড়ানো যায় না। এড়াতে বলা উচিতও নয়। খালি একটু খেয়াল রাখুন, কারও সঙ্গে আপনার মেয়ের ভার্চুয়ালি বেশি বন্ধুত্ব হচ্ছে কি না। সে যতটা সময় সাধারণত সোশ্যাল মিডিয়ায় কাটায়, তার চেয়ে বেশি সময় কাটাচ্ছে কি না। অনেক রাত পর্যন্ত ফোন বা ল্যাপটপে আটকে রয়েছে কি না। যদি মেয়ে এমনিতে আপনাদের সব বলে কিন্তু দেখেন এই ব্যাপারটা এড়িয়ে যাচ্ছে… তাহলে কিন্তু এটা নিয়ে ভাবনাচিন্তা করার সময় এসেছে। তা বলে হেলিকপ্টারিং করবেন না। বকাবকি তো করবেন না-ই। যদি মেয়ের কোনও ব্যবহার স্বাভাবিকের চেয়ে আলাদা লাগে, তার সঙ্গে খোলাখুলি কথা বলুন। গল্পে গল্পে জানতে চান, তার সঙ্গে নতুন কারও বন্ধুত্ব হয়েছে কি না। নতুন বন্ধুর সম্পর্কে কতটা জানে সে। যে তথ্যগুলো সেই বন্ধু নিজের সম্পর্কে বলছে বা সোশ্যাল নেটওয়ার্কে দিয়েছে, সেগুলো আর-একবার খুঁটিয়ে দেখে নেওয়ার পরামর্শ দিন। ‘তুই কিছু বুঝিস না’ জাতীয় কথা বলবেন না মেয়েকে। বরং তাকে বোঝান, যে তার বিচারবুদ্ধির উপর আপনাদের আস্থা রয়েছে। খালি চারপাশে বিপদের ভয় এত বেশি বলেই একটু বাড়তি সতর্ক থাকা প্রয়োজন। তা হলে দেখবেন, মেয়েও আপনাদের বিশ্বাসের মর্যাদা রাখতেই আরও সতর্ক হবে। কোথায় কী ঘটছে, কোনখানে অসতর্ক হলে বিপদে পড়তে হতে পারে… ইনফরমেশন বুমের কল্যাণে এসব তথ্য পেতে এখন আর আমাদের কোনওই অসুবিধা হয় না। খেয়াল রাখুন, মেয়ে যেন এগুলো সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকে। টিন-এজার মানে অনেকটাই বড় হয়েছে সে। যথেষ্ট বুদ্ধিমতীও। যদি চোখ-কান খোলা রাখে, তাহলে পরিস্থিতির গুরুত্ব নিজেই বুঝবে। আর সেটা যাতে রাখে, বাবা-মা হিসেবে তা দেখা আপনাদের দায়িত্ব। প্রয়োজন পড়লে সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে বাড়ির সকলে আলোচনাও করতে পারেন মাঝে মাঝে। কিন্তু আলোচনার সুর কীরকম হবে, সে ব্যাপারে সতর্ক থাকবেন। অতিমারি এবং ইচ্ছেমতো বাইরে বেরতে না পারার কারণে পরিস্থিতি এমনিই উদ্বেগে, বিষণ্ণতায় মাখামাখি হয়ে রয়েছে। আপনাদের কথায় যেন আপনাদের সন্তান আরও বেশি ভয়ের, বিষণ্ণতার শিকার না হয়ে পড়ে। সাবধানতা আর ভয়ের মাঝখানে একটা না-সরু, না-চওড়া গণ্ডি রয়েছে।  সেটা নির্ধারণ করে দেওয়া আপনাদের দায়িত্ব। সবচেয়ে বড় কথা… সন্তানকে রুখে দাঁড়াতে শেখান। সে নিজে যদি কখনও, কোথাও, কোনও অপ্রীতিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি পড়ে, বা অন্য কাউকে পড়তে দেখে,